ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ৩০শে কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

অবহেলায় পর্যটন

প্রকাশিত : ০৪:৪১ অপরাহ্ণ, ৭ আগস্ট ২০১৯ বুধবার ৫৭ বার পঠিত

নিউজ ডেস্ক
alokitosakal

‘ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া’ আপন দেশটাকে দেখার ফুরসত পান না ঈদের ছুটি তাদের জন্য মোক্ষম সময়। সে যে ক’দিনই ছুটি মিলুক ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে যান দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেই। অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি দেশের দর্শনীয় নানা স্থাপত্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো দেখে আসা বা বেড়িয়ে আসা ছুটির দিনের প্রধান বিনোদন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাদের দূর-দূরান্তে যাওয়ার সাধ্য নেই তারা ঘরের পাশের বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে অন্তত ঢুঁ মারেন। এটাই এখন উৎসবের রেওয়াজ। কিন্তু ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে ভ্রমণ উপেযাগী করার দিকে মনোযোগ নেই কারো।

নাজুক যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তাহীনতা, অবকাঠামো দুর্বলতা, আবাসন সংকট এবং পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকার কারণে অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত মুখ থুবড়ে পড়ছে। পোশাক-আশাক, প্রসাধনী, খাবার-দাবার, পরিবহন, আসবাব, গৃহসজ্জা, বিনোদন ইত্যাদি খাতের মতো ‘পর্যটন’ খাত ঈদ অর্থনীতিতে বরাবরই অবহেলিত থেকে যাচ্ছে, অর্জন করছে না ইপ্সিত সাফল্য। অথচ একটু উদ্যোগী হলেই ঈদ অর্থনীতিতে যুক্ত হতো বিপুল দেশি-বিদেশি আয়। দেশের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও অচিন্ত্যনীয় ভূমিকা রাখতো উৎসবকেন্দ্রিক অর্থপ্রবাহ। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সারাবছর বা ঈদের সময় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ঠিক কত মানুষ বেড়াতে যায় তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই।

তবে ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) ধারণা বছরজুড়ে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ দেশি পর্যটক দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ভ্রমণ করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন সমুদ্রনগরী কক্সবাজার। এ সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখের বেশি। এর মধ্যে কেবল ঈদের ছুটিতেই কক্সবাজারে বেড়াতে যান প্রায় তিন লাখ মানুষ। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো বলে কক্সাবাজারে পর্যটক সমাগম একটু বেশি হয়ে থাকে। তবে যারা নিয়মিত কক্সবাজার ভ্রমণ করেন তাদের অভিযোগ ওপরে আকাশ আর নিচে সমুদ্র ছাড়া কক্সবাজারে বিনোদনের আর কোনো ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় পর্যায়ের ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে নানা দুর্বলতা। ফলে বিদেশি পর্যটক তো বটেই কক্সবাজারের প্রতি দিন দিন আগ্রহ হারাচ্ছে দেশি পর্যটকরাও। শুধু কক্সবাজার নয়, দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেই দিন দিন দর্শনার্থীর সংখ্যা কমছে। আর দেশি পর্যটক বাগিয়ে নিচ্ছে ভারত, নেপাল, ভুটান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মিসর, তুরস্কসহ ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশ।

ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানগুলো জানাচ্ছে, এবারের ঈদের ছুটিতে প্রায় ৬ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে ভ্রমণে যাচ্ছে। সারা বছরে এ সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখের মতো। সাধারণত মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চমধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলো ঈদের ছুটির সময়টা দেশের চাইতে দেশের বাইরে কাটাতেই বেশি পছন্দ করেন। কারণ- বাইরের দেশগুলোতে পর্যটকদের বিনোদনের জন্য যেমন বৈচিত্র্যপূর্ণ আয়োজন থাকে তেমনি নিরাপদ ও নির্ঝঞ্ঝাট ভ্রমণের নিশ্চয়তা থাকে। অথচ বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলো তার উল্টো। কোনো পর্যটন কেন্দ্রেই বিনোদনের বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবস্থা তো নেই-ই, নিরাপত্তারও ভয়াবহ সংকট। তা ছাড়া অবকাঠামো সংকটের কারণে থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত নেই অধিকাংশ পর্যটনকেন্দ্রে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোকে আকর্ষণীয় করে তোলা এবং দর্শনার্থী টানার ব্যাপারে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো উদ্যোগই নেই। এর মধ্যে বাংলাদেশের অধিকাংশ পর্যটনকেন্দ্রে যোগাযোগব্যবস্থা নাজুক হওয়ায় ভোগান্তি নিয়ে কেউ ভ্রমণ করতে আগ্রহী হয় না। ফলে উপায়ান্ত না দেখে ছুটির মোক্ষম দিনগুলোতে বিদেশেই পাড়ি দিচ্ছেন দেশি পর্যটকরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা বছর ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ দেশের বাইরে ভ্রমণ করে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ করে ঈদের লম্বা ছুটিতে।

কক্সবাজারে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, প্রবালদীপ সেন্টমার্টিন, ইনানী, সোনাদিয়া দ্বীপ, বান্দরবানের নীলগিরি, নীলাচল, রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদ, সাজেক ভ্যালি, শুভলং ঝর্ণা, চট্টগ্রামের ফয়েস লেক, সিলেটের বিছানাকান্দি, রাতারগুল, জাফলং, মৌলভীবাজারের লাউয়ারছড়া বন, শ্রীমঙ্গলের নয়নাভিরাম চা বাগান, পটুয়াখালীর

সাগরকন্যা কুয়াকাটা, ভোলার মনপুরা, হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ, খুলনা-বাগেরহাটের ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন, নেত্রকোণার বিরিশিরি, হাকালুকি-টাঙ্গুয়ার হাওর, রংপুরের রামসাগর দীঘির মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি দেশে অনেক ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানও রয়েছে। মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর, কান্তজীর মন্দির, সোনারগাঁও, রামুর বৌদ্ধমন্দির, ঢাকার লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, ষাটগম্বুজ মসজিদ, খান জাহান আলীর মাজার, রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘর, বাঘা মসজিদ, মুন্সীগঞ্জের ইন্দ্রকপুর দুর্গ, নরসিংদীর ওয়ারি বটেশ্বর, কুষ্টিয়ার লালন শাহের মাজার, রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ির মতো প্রত্নতাত্ত্বিক এসব নিদর্শনের প্রতি দেশি-বিদেশি পর্যটকের আগ্রহও বাড়ছে। কিন্তু এসব নিদর্শনকে কেন্দ্র করে যেখানে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার কথা তা গড়ে ওঠেনি কোথাও।

ভুক্তভোগী পর্যটক আরেফীন আনজুম খোলা কাগজকে বলেন, তিন পার্বত্য জেলার দর্শনীয় পর্যটনকেন্দ্রগুলো এখনো দুর্গম। যোগাযোগব্যবস্থা যেমন নাজুক তেমনি নিরাপত্তাজনিত কারণে এসব এলাকায় পর্যটকের আনাগোনা কমছে দিন দিন। কুয়াকাটায় সুর্যোদয়ের সৈকত দেখার জন্য এখনো কম ভোগান্তি পোহাতে হয় না। রাস্তাঘাটের কিছুটা উন্নতি হলেও সেখানে পর্যাপ্ত থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। নিরাপত্তাব্যবস্থা তো আরও দুর্বল।

আরেক পর্যটক সমীরণ দাস জানান, দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো হচ্ছে আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস ঐতিহ্যের স্বাক্ষর। সরকারি ব্যবস্থাপনায় এসবের বিপুল প্রচার-প্রসার করার দরকার ছিল। অথচ বিদেশি পর্যটক তো দূরের কথা দেশের মানুষও জানে না কোথায় কী আছে। এ ক্ষেত্রে পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণ সংশ্লিষ্টরা কোনো ভূমিকাই রাখছেন না। তিনি বলেন, শুধু কক্সবাজার নয়, সুন্দরবনের মতো বিশাল প্রাকৃতিক সম্ভার ভ্রমণের অসাধারণ জায়গা হতে পারে। বেসরকারি পর্যায়ে কেউ কেউ উদ্যোগ নিলেও সরকারি পর্যায়ে একে আরও বেশি তুলে ধরার কোনো উদ্যোগ নেই। আর যোগাযোগের বিষয়টা তো আরো বেশি নাজুক। তিনি দেশি পর্যটকের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন।

ট্যুরিজম ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টিডাব) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জামিউল আহমেদ এ ব্যাপারে বলেন, প্রতিবছর ২৫ লাখ মানুষ দেশের বাইরে ভ্রমণ করলেও বিদেশ থেকে দেশে আসে মাত্র এক লাখের কিছু বেশি পর্যটক। আমাদের দর্শনীয় স্থানগুলোকে আরো আকর্ষণীয় করতে পারলে এ সংখ্যা নিঃসন্দেহে বাড়বে। বিশেষ করে আমাদের দেশে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ‘নাইট লাইভে’র ব্যবস্থা নেই। এটা করতে হবে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বর্ণমালা টিভি'কে জানাতে ই-মেইল করুন- bornomalatv@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

বর্ণমালা টিভি'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

1

2

3

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। বর্ণমালা টিভি | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: রাইতুল ইসলাম