ঢাকা, বুধবার ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ৮ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

নিয়ন্ত্রণের বাইরে ডেঙ্গু

প্রকাশিত : ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ, ৭ আগস্ট ২০১৯ বুধবার ১০ বার পঠিত

নিউজ ডেস্ক
alokitosakal

 

ডেঙ্গু এখন ভীতি আর মৃত্যু আতঙ্কের নাম। কোনো তত্ত্ব আর বক্তব্যই এর নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে না। মেয়রও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে গুজব ছড়ানো হচ্ছে বলে দায় এড়াতে পারছেন না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মাঝে মধ্যে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে মন্তব্য করলেও দেশের মানুষ তার এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন।

শুরুতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন তাদের ওষুধ শতভাগ কার্যকর দাবি করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবির বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে আসছিলো। তবে সে প্রতিবেদন আমলে নিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নতুন ওষুধ কিনেছিলো।

আগের সরবারহকারীকেও কালো তালিকাভুক্ত করেছিলো। কিন্তু কোনোভাবেই ডেঙ্গু মোকাবিলায় আসছে না। এমন পরিস্থিতিতে মশা মারতে কামান দাগার মতো অবস্থা। বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। আদালতে সিটি কর্পোরেশনের আইনজীবী হাস্যকর তথ্য দেয়- ‘উত্তরে মশার ওষুধ ছিটালে নাকি মশা দক্ষিণে চলে আসে। আবার দক্ষিণে মশার ওষুধ ছিটালে নাকি তারা উত্তরে উড়ে চলে যায়।’

এসব হাস্যকর তথ্য দিয়ে চায়ের আড্ডায় বেশ সমালোচিতও হয় সরকার। দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদেরও তলব করেছিলো আদালত। তখন তারা বলেছিলো নতুন ওষুধ আমদানি করতে হবে। মশা পুরনো ওষুধে মরে না।

তারা আরও প্রতিরোধী হয়ে ওঠেছে। এরপর আদালত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিবকেও ডেকেছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন, এখনো নতুন ওষুধ আমদানি হয়নি কেন? কবে নাগাদ আসবে ওষুধ।

সবকিছুর জবাব দিতে পারেননি এই কর্মকর্তা। তবে শিগগিরই নতুন ওষুধ আসছে বলে জানিয়েছিলেন। এতকিছুর পরও কাজের তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। ভারত থেকে মশার ওষুধের নমুনা এসেছে।

আবদ্ধ জায়গায় মশার ওপর ওষুধের পরীক্ষা চালানো হয়েছে। কিন্তু মশা মরে না। আবার এসবের মধ্যে যুক্ত হয়েছে মন্ত্রী, এমপি, আমলা, অভিনেতা-অভিনেত্রী আর সেলিব্রেটিদের প্রতীকী রাস্তা পরিষ্কার কর্মসূচি।

দেশে যখন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একের পর এক পরিবার স্বজন হারাচ্ছে, হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। তখন এই ফটোবাজির রাস্তা পরিষ্কারকে দেশের মানুষ ভালোভাবে নিচ্ছে না। তাই সংশ্লিষ্টদের আরও সংযত আচরণ করার বিষয়ে লন্ডনে চিকিৎসাধীন খোদ প্রধানমন্ত্রী কথা কম বলে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না। এখনো ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণহীন। বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তদের সংখ্যা।

হাসপাতালে সিট সংকট। ঢাকার অধিকাংশ বিশেষায়িত হাসপাতাল এখনো নিশ্চুপ। ডেঙ্গু শনাক্তকরণের কিটের কৃত্রিম সংকট। মশানিধনে নেই বড় উদ্যোগ। ফলে দেশের মানুষ দেখছে একটি সমন্বিত উদ্যোগের বড় অভাব।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সস্ত্রীক গত রোববার হজে যাওয়ার কথা ছিলো স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলামের। পরে সমালোচনা এড়াতে তিনি তার সে হজ পালন বাতিল করেন।

এদিকে গত সোমবার ঢাকার ডেঙ্গু মোকাবিলায় উত্তর সিটি কর্পোরেশন কলকাতা পৌরসংস্থার ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়েছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। অতীন ঘোষ তখন ডেঙ্গু প্রতিরোধে কীটনাশক প্রয়োগের চেয়ে এডিস মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংসের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন।

এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী একের পর এক অনুষ্ঠনে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কথা বলে বেড়াচ্ছেন। গত সোমবারও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীদের দেখতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আগের চেয়ে কমে এসেছে। খুব শিগগিরই সব নির্মূল হয়ে যাবে।

তবে বাস্তবতা ভিন্ন। আগস্ট মাসের গত ৬ দিনে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে ১১ হাজার ছাড়িয়েছে। শুধু গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আছে বলা তামাশার সামিল।

এদিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বীকার করে গতকাল মঙ্গলবার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের এক জরুরি সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ঢাকা সিটিতে প্রতিদিনই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ডেঙ্গু এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ক্যামেরার সামনে ফটোসেশনের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান নয়।

নামকাওয়াস্তে কয়েকটি কর্মসূচি পালন করলাম এরকম নয়। দায়সারা গোছের কর্মসূচির কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা মুখে যতটা নিয়ন্ত্রণের কথা বলি না কেন এখনো নিয়ন্ত্রণে আসে নেই। সামনে ঈদ, ঈদে অনেকে শহর ছেড়ে ঘরমুখো হবেন। অনেকে যাচ্ছেন, অনেকে যাবেন, এখানেও ডেঙ্গুজ্বরের বিস্তারের আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের সবাইকে সতর্ক হতে হবে। সাবধান হতে হবে এবং আমাদের করণীয়যথাযথভাবে পালন করতে হবে।

তিনি বলেন, এডিস মশা ভয়ঙ্কর, এরা কামড় দিতে চেহারার দিকে তাকায় না। আপনি কাউন্সিলর, মন্ত্রী, এমপি নাকি মেয়র কোনো দিকে তাকাবে না। সুযোগ পেলে রক্ত খাবে, মেয়রেরও রক্ত খাবে, মন্ত্রীর রক্ত খাবে, এমপির রক্ত খাবে, নেতার রক্ত খাবে-কাউকে ছাড়বে না।

মৃত্যুর মিছিলে প্রতিদিন নতুন নাম
প্রতিদিন আক্রান্তের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। সরকারি হিসেবেও এখন মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ জন। আগস্টের এই ৬ দিনে তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে বেসরকারিভাবে পাওয়া তথ্য ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে যে, এ পর্যন্ত অন্তত ৬০ জনের অধিক মানুষ সারা দেশে মারা গেছে। এদের মধ্যে নারী ও শিশুরা বেশি।

গতকালও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মনোয়ারা বেগম (৭৫), আমজাদ মণ্ডল (৫২) ও হাবিবুর রহমান (২১) নামে তিনজন ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। এ নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ১৭ জনে। মনোয়ারা বেগমের বাড়ি চাঁদপুর, আমজাদ মণ্ডলের বাড়ি মানিকগঞ্জের শিবালয়ের কেটুয়াধারা গ্রামে এবং হাবিবুর রহমানের বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানায়।

গতকাল ঢামেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. নাছির উদ্দীন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গতকাল রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে রিয়ানা (৩) নামে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রবিউল ইসলাম (১৭) নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীর অদূরে নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলায় ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত ফাহিমা আক্তার (৩০) নামে এক নারী মারা গেছেন। তিনি ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বাড়ি গিয়েছিলেন।

এদিকে গত সোমবার রাতেও ইতালী প্রবাসি হাফসা লিপি (৩৪) রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে ডেঙ্গুর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। গত সোমবার ঢাকায় মারা গেলো পাবনার শিশু নাইসা (৫ মাস)। গত সোমবার চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার শিশু মদিনার প্রাণ কেড়ে নিলো ঘাতক ডেঙ্গু। সে কেজি ওয়ানে পড়তো। এছাড়াও গত সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে মারা যান নকুল কুমার দাস নামে এক ডেঙ্গু রোগী।

৫০০ শয্যার হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ৪৮৪ জন!
৫০০ শয্যার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৮৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির উপ-পরিচালক ডা. মো. খাইরুল আলম। তিনি বলেন, এদের মধ্যে মেডিসিন ওয়ার্ডে ৩৭৩, শিশু ওয়ার্ডে ৭৯ এবং কেবিনে ভর্তি ৩২ জন। আর টোটাল রোগীর সংখ্যা ৭৯০ জন। অর্থাৎ এই মুহূর্তে মুগদা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর ৬১ শতাংশ হচ্ছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত।

দেশের বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্য মতে, গতকাল মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ৩৪৮ জন। এদের মধ্যে ঢাকায় ভর্তি আছে এক হাজার ২৭৮ জন।

এদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৮৩ জন। মিটফোর্ড হাসপাতালে ১০৪ জন। সরকারি শিশু হাসপাতালে ৩৮ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৮৬ জন। বারডেম হাসপাতালে হয়েছে ২০ জন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৩ জন।

রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স হাসপাতালে ২৬ জন, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২১ জন, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৪৮ জন এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৪২ জন। এছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ৪৬৬ জন ভর্তি আছে এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন হাসপাতাল ক্লিনিকে ভর্তি আছে এক হাজার ৬৪ জন।

চলতি বছরের পয়লা জানুয়ারি থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ২৯ হাজার ৯১২ জন। চলতি মাসে তিনজন, জুলাইতে ১৫ জন, জুনে তিনজন এবং এপ্রিলে দুইজনসহ ১৮ জন মারা গেছে। যার মধ্যে বেসরকারি হাসপাতালেই ১৮ জন মারা গেছে। ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে এখনো হাসপাতালে রয়েছে ৭ হাজার ৯৬৮ জন।

চিকিৎসাসেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২১ হাজার ৯২১ জন। আক্রান্তদের মধ্যে শুধু ঢাকায় আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ২০২ জন। হাসপাতালে আছে ৫ হাজার ১৮২ জন। আর বাড়ি ফিরেছে ১৬ হাজার ৯৯৭ জন। শুধু বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৯ হাজার ৪৩৩ জন।

এদের মধ্যে এখনো হাসপাতালে আছে দুই হাজার ১৫৯ জন। আর বাড়ি ফিরেছে সাত হাজার ২৫৬ জন। ঢাকার বাইরে এ পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছে সাত হাজার ৭১০ জন এদের মধ্যে এখনো আছে দুই হাজার ৭৮৬ জন। আর বাড়ি ফিরেছে চার হাজার ৯২৪ জন। শুধু আগস্ট মাসের ছয়দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ১১ হাজার ৪৫১ জন।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি বর্ণমালা টিভি'কে জানাতে ই-মেইল করুন- bornomalatv@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

বর্ণমালা টিভি'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

1

2

3

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। বর্ণমালা টিভি | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: রাইতুল ইসলাম